বাংলাদেশে শ্রম অভিবাসন: বর্তমান গতিপ্রকৃতি ও চ্যালেঞ্জ
মানব সভ্যতার আদিকাল থেকেই অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অভিবাসন একটি নিয়মিত ঘটনা। বৈশ্বিক শ্রম বাজারের চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্য বজায় রাখতে এটির গুরুত্ব অপরিসীম। প্রাচীনকালে খাদ্য, পানি ও নিরাপত্তার সন্ধানে মানুষ স্থানান্তরিত হতো। অষ্টাদশ শতাব্দীর শিল্পবিপ্লবের পর শ্রমিক হিসেবে অভিবাসন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। আধুনিক শ্রম অভিবাসনের সূচনা হয় ভারী শিল্পের প্রসার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিস্তৃতি ও নতুন কলকারখানার জন্য শ্রমিকের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে।
বাংলাদেশে শ্রম অভিবাসনের ইতিহাস:
ব্রিটিশ শাসনকাল থেকেই বাংলাদেশ থেকে অভিবাসন চলে আসছে। তবে রাষ্ট্রীয়ভাবে নথিভুক্ত শুরু হয় ১৯৭৬ সাল থেকে মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে। সরকারি হিসাবে, ১৯৭৬ সাল থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ৪৯ লাখ ৮৩ হাজার লোক বিশ্বের ১৭৩টিরও বেশি দেশে অভিবাসন করেছে। পুরুষদের তুলনায় নারী অভিবাসনের হার তুলনামূলকভাবে কম (প্রায় ৭.৫০% - বিএমইটি)।
শ্রম অভিবাসনের কারণ ও ধরণ:
দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব, সামাজিক নিরাপত্তা হুমকি, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক উন্নতি, উন্নত জীবনযাপন, মেধার প্রয়োগ এবং সৃজনশীল কাজের সুযোগের আশায় মানুষ অভিবাসন করে। নিয়মিত অভিবাসনের পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসনও একটি বড় সমস্যা।
২০২৪ সালের অভিবাসন প্রবণতা (রামরু'র প্রতিবেদন):
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিট (রামরু) ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, গত বছরের তুলনায় অভিবাসনের হার ৩০.৮ শতাংশ কম হতে পারে। জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৯ লাখ ৬ হাজার ৩৫৫ জন অভিবাসন করেছেন, যা ২০২৩ সালের ১৩ লাখ ৫ হাজার ৪৫৩ জনের তুলনায় অনেক কম। নারী অভিবাসনের হারও সর্বনিম্ন রেকর্ডে রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের কারণে জুলাই ও আগস্ট মাসে অভিবাসন ব্যাহত হয়েছিল। অনেক দেশে অভিবাসন বন্ধ রয়েছে (ওমান, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালদ্বীপ ইত্যাদি)। ইতালি ও সার্বিয়ায় জাল কাগজপত্র ও সার্ভারের সমস্যার কারণে অভিবাসন কার্যক্রম স্থবির রয়েছে। একক গন্তব্য কেন্দ্রিক বাজার ব্যবস্থার কারণেও বাজার বন্ধ হচ্ছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
রেমিট্যান্স:
২০২৪ সালের প্রথম সাত মাসে ১৫.০২ বিলিয়ন ডলার ও আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৯.২২৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৪ সালে মোট রেমিট্যান্স ২৬.৪ বিলিয়ন ডলার হতে পারে, যা গত বছরের চেয়ে ৩২.৫৪ শতাংশ বেশি। তবে যে দেশে অভিবাসন বেশি, সে দেশ থেকে রেমিট্যান্স বেড়েছে না।
শ্রম অভিবাসনের তাত্ত্বিক ধারণা:
শ্রম অভিবাসন নির্ভর করে উৎস দেশের (পুশ ফ্যাক্টর) অর্থনৈতিক অবস্থা, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ইত্যাদি এবং গন্তব্য দেশের (পুল ফ্যাক্টর) অধিক আয়ের সুযোগ, কর্মের নিশ্চয়তা, উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ ইত্যাদির উপর। এছাড়াও ভ্রমণের সহজলভ্যতা, কূটনৈতিক সম্পর্ক, ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ইত্যাদি কারণগুলোর প্রভাব রয়েছে।
সিদ্ধান্ত:
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শ্রম অভিবাসনের গুরুত্ব অপরিসীম। দারিদ্র্য হ্রাস ও উন্নয়নে এর অবদান অস্বীকার করা যায় না। তবে অভিবাসন ব্যবস্থায় সুশাসন, দুর্নীতি দমন, নৈতিক ও নিরাপদ অভিবাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে এই খাতকে আরও টেকসই করা জরুরি।